January 28, 2026 8:40 pm

বিকাশ মজুমদারের কলামঃ ইসলামের সাথে কমিউনিজমের অবৈধ সম্পর্ক

হিন্দু নিশ্চিহ্নের ইহুদিদের ভাগ্য ইসলামের সাথে কমিউনিজমের দুর্গোৎসবে

ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি বাম রাজনীতি করা লোকজন সাধারণত নিরীশ্বরবাদী হয়ে থাকেন। সুতরাং আপাত দৃষ্টিতে বাম রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে ইসলামের শত্রু ভাবাপন্ন সম্পর্ক মনে হলেও বামের সাথে ইসলামের অন্তরঙ্গ অবৈধ পীরিত বিদ্যমান।

কম্যুনিস্টদের মতে কমিউনিজম হলো সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা, সকলের সাম্যতা নিশ্চিত করে এবং দলের নেতারা হলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী এবং কর্তৃপক্ষ। কম্যুনিজম ধর্মের জন্ম হয়েছে কার্ল মার্ক্সের হাত ধরে, তার চিন্তার বিশ্বস্ত সহচর ছিলেন ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস। দীর্ঘদিন দুজন গবেষণা করেছেন ব্রিটিশ মিউজিয়ামের রিডিং রুমে। ১৮৪৮ সালে দুজন মিলে বের করেন কম্যুনিস্ট পার্টির ম্যানিফেস্টো এবং ইংল্যান্ডের মত পুঁজিবাদী দেশে জন্ম দেন কম্যুনিস্ট লীগ নামের রাজনৈতিক ধর্মের ম্যানুয়াল।

১৮৬৭ থেকে ১৮৯৪ সালের মধ্যে তিনখণ্ডে প্রকাশিত ‘দ্য ক্যাপিটাল’ নামের পবিত্র গ্রন্থেই নিহিত আছে কম্যুনিস্ট পার্টির প্রাণ ভোমরা। তারপর মার্ক্সের সমাজতান্ত্রিক সাম্যবাদী ধর্মকে বিকশিত শাখায় পল্লবে শিকড়ে বিকশিত করেছে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, ফিডেল ক্যাস্ট্রো, চে গুয়েভারা, মাও সেতুং, জোসেফ স্ট্যালিন আরও অনেক। দ্য ক্যাপিটাল গ্রন্থেও বলা হয়েছে বঞ্চনার ইতিহাস দ্রুত শেষ হয়ে আসছে এবং প্রলেতারিয়েত শ্রেণি বুর্জোয়াদের হারিয়ে ক্ষমতা দক্ষল করবে।

অপরদিকে ইসলাম ধর্মেরও একজন প্রবর্তক ছিলেন এবং তিনিও ধর্ম প্রচারের আগে দীর্ঘদিন হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন ছিলেন এবং তারপর তার উপর নাজিল হলো পবিত্র কোরআন শরিফ এবং তার সাথেও অনেক সঙ্গী ছিলেন। দ্য ক্যাপিটাল এবং কোরআন দুইটা পবিত্র গ্রন্থেরই পঠন পাঠন সারা পৃথিবীব্যাপী এখনো জোরেসোরে চলছে এবং নিকট ভবিষ্যতে থামার কোন সম্ভাবনা নাই।

কম্যুনিজমে সকল নাগরিককে রাষ্ট্রের কাছে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করতে হয়। ইসলামেও সব মুসলিমকে আল্লাহর কাছে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ বাধ্যতামূলক। কম্যুনিস্ট পার্টিতে নেতারাই ঠিক করে দেন রাষ্ট্রের নাগরিকদের চাওয়া পাওয়া এবং নির্ধারণ করেন দেশের আইনকানুন, বিচার ব্যবস্থা। ইসলামের আছে শরিয়া আইন। কম্যুনিস্ট পার্টির নেতারা নিজেদের খেয়ালখুশি মত আইন বানায়, পরিবর্তন করে, ব্যবহার করে তেমনি ইসলামের চিন্তাবিদ, ইমাম, মুফতি, মাওলানা নিজেদের উপযোগী কোরআন, হাদিসের ব্যাখ্যা দাঁড় করান যাকে বলে ফতোয়া। একজন খাঁটি কম্যুনিস্ট বা একজন সত্যিকারের মুসলিমের মনে এসব অসামঞ্জস্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলেও মেনে চলতে বাধ্য কারণ প্রশ্ন করলে ধড়ে মাথা থাকার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।

কম্যুনিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিরোধীপক্ষের অনুপস্থিতিতেই প্রকৃত শান্তি খুঁজে পায়। কম্যুনিস্টরা মনে করে কম্যুনিজম হলো দুনিয়ার সবথেকে শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা এবং সবদেশের উচিৎ কম্যুনিজমের কাছে নিজেদের সঁপে দেয়া আর সারা পৃথিবীর এই শাসনব্যবস্থার ছায়াতলে চলে আসা উচিৎ। যদি না আসে তাহলে বিপ্লব লরে সেখানে কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিপ্লবের পথে বাঁধা আসলে সেই বাঁধার বিন্ধ্যাচল বার্লিন দেয়ালের মত চুর্ণ করে দিতে হবে। কম্যুনিজমে দুইটা পক্ষ আছে যথা বুর্জোয়া আর প্রলেতারিয়েত। প্রলিতারিয়েত লোকজন হলো হ্যাভনট, শ্রেনি সংগ্রামের মাধ্যমে বুর্জোয়া গোষ্ঠীর কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে হবে।

ইসলামের বিশ্বাসও ঠিক একই রকম। ইসলামই হলো একমাত্র সত্য এবং সঠিক পথ। ইসলামই দিচ্ছে একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। কম্যুনিজমের মত ইসলামকেও পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। এমনকি সেক্ষেত্রে যদি তরোয়ালের সাহায্য নিতে হয় তাতেও কোন নিষেধ নাই। প্রতিটি ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত জিহাদ চালিয়ে যাওয়া প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি দ্বায়িত্ব। ইসলামও কম্যুনিস্ট কায়দায় পৃথিবীকে দুইটা অঞ্চলে ভাগ করেছে ‘দারুল ইসলাম’ শান্তিপূর্ণ অঞ্চল এবং ‘দারুল হার্ব’ কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাক্রান্ত অঞ্চল। পুরো পৃথিবীর সব মানুষ যেদিন ইসলাম গ্রহণ করে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত চূড়ান্ত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না।

কম্যুনিজম তার প্রচার প্রসারের জন্য প্রপাগান্ডা ব্যবহার করে থাকে এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তথ্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। কম্যুনিস্ট রাস্ট্রের নাগরিকদেরকে মিথ্যে আশ্বাস ও ভরসা দিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে এমন অবস্থা করে যেন তারা গ্যাস বেলুনের মত উড়ে যেতে পারবে। প্রায় সময় বিদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির সময় তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে কার্য উদ্ধারের চেষ্টায় নিয়োজিত থাকতে দেখা যায় কিন্তু কার্যসিদ্ধির পরে চুক্তি ভেঙে ফেলতে দ্বিধা করে না।

একইভাবে ইসলামেও তাকিয়া নামে এক অদ্ভুত বস্তু আছে। তাকিয়া রাজনৈতিক ইসলামের একটা গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র এবং বৈশিষ্ট্য। কোন অঞ্চলের দখল নিতে বা প্রভাব বিস্তার করতে অন্তঃসারশূন্য প্রচারণা, তথ্যের বিকৃত উপস্থাপনা, বিপথগামী করা রাজনৈতিক ইসলামের তাকিয়াবাজির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইসলাম কখনো শান্তি চুক্তি সমর্থন করে না; বড়জোর যুদ্ধ (হুদনা) বিরতি হতে পারে। হুদনা চুক্তি বিষয়টা এরকম যেন সাময়িক অস্ত্র বিরতি যেটা কখনোই দশ বছর অতিক্রম করতে পারবে না। মুসলিমরা অস্ত্র এবং সেনাবাহিনী জোগাড় করে যুদ্ধ জয়ের সম্ভাবনাময় অবস্থায় আসলেই যেকোন সময় যেকোন দিন হুদনা চুক্তি ভেঙে দিয়ে নতুন করে যুদ্ধ ঘোষণা দিতে পারে।

কম্যুনিস্ট দেশে পার্টি নেতারা কখনো ভূল করেন না এবং তাদের শাসন সর্ব উৎকৃষ্ট। পার্টির নেতারা যেকোন সময় যেকোন আইন পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংকোচন, বিয়োজনযা খুশি তাই ইচ্ছা মতো করতে পারে কারণ তাদের বাধা দেয়ার কেউ নাই। যদি কেউ মাথাচাড়া উঠে, প্রশ্ন করে তবে সে প্রতিবিপ্লবী, সে শ্রেণি শত্রু খতমের অন্তরায় সুতরাং তাকেই গ্রেফতার করে সংশোধনের জন্য লেবার ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয়, বেশি ঝামেলাপূর্ণ মনে হলে খতম করে দেয়াও বাড়াবাড়ি কিছু নয়।

ইসলামেও একই অবস্থা। ইসলামের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারবে না বললেই সে কাফের, মুরতাদ, মুনাফেক, মুশরিক এবং তাকে হত্যা করা জায়েজ। কম্যুনিজম এবং ইসলাম দুই পক্ষই গণতন্ত্র, পশ্চিমা চিন্তা, আধুনিকতাকে শত্রু মনে করে এবং ঘৃণা করে। তাদের ধারণা গণতন্ত্র, আধুনিকতা সব সময় ইসলাম এবং কম্যুনিজমের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

লেখকঃ বিকাশ মজুমদার
মানবাধিকার কর্মী ও সমাজকর্মী
নিউইয়র্ক, ইউএসএ

তারিখ: ৩১ আগস্ট, ২০২৫

আরো খবর পড়ুন

[মাইনোরিটিওয়াচে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

গ্যারেজে চঞ্চল ভৌমিকের The Death of Chanchal Bhowmik
ধর্ম

নরসিংদীর গ্যারেজে চঞ্চল ভৌমিকের রহস্যজনক দগ্ধ মরদেহ এবং অনিশ্চিত তদন্ত

নরসিংদীর একটি গ্যারেজে গভীর রাতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে এক তরুণ শ্রমিকের মৃত্যু। নিহত চঞ্চল ভৌমিকের মৃত্যু দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—এ প্রশ্নের

Read More »
দীপু চন্দ্র দাস হত্যা Killing of Dipu Chandra Das
ধর্ম

‘নারায়ে তাকবীর’ স্লোগানে দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড ও বিচারের অনিশ্চয়তা

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় একটি পোশাক কারখানার ভেতর থেকে দীপু চন্দ্র দাস নামের একজন শ্রমিককে ধরে নিয়ে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা এবং

Read More »
ফটিকছড়িতে রাতভর গণপিটুনি Overnight Mob Beating in Fatikchhari
শিশু

ফটিকছড়িতে রাতভর গণপিটুনি: সেতুর সঙ্গে বেঁধে কিশোর হত্যা, আহত দুইজন

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে চুরির সন্দেহে তিন কিশোরকে সেতুর রেলিংয়ের সঙ্গে বেঁধে রাতভর পিটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বেদনাদায়ক এই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত

Read More »
আব্দুল্লাহ আল মাসুদ Abdullah Al Masud
অন্যান্য

বাংলাদেশী ব্লগার ও মানবাধিকার কর্মী মুফতি আব্দুল্লাহ আল মাসুদ ভারতে গ্রেফতার

নির্বাসিত বাংলাদেশী লেখক, ব্লগার ও মানবাধিকার কর্মী আব্দুল্লাহ আল মাসুদ ভারতে গ্রেফতার হয়েছেন। নভেম্বরের ৩ তারিখ পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার কল্যাণী

Read More »
পাথর দিয়ে নির্মম হত্যা স্বর্ণময়ীর মৃত্যু
মতামত

“ভচকানো” বাংলার প্রতিশোধ: স্বর্ণময়ীর মৃত্যু নয়, এক কর্মসংস্কৃতির চপেটাঘাত

“যার ব্রে’স্টের শেপ এরকম ভচকানো, তার বাংলাটা ভচকানো হবে।” এই এক বাক্যই যথেষ্ট বুঝিয়ে দেয়, কেমন বিষাক্ত মানসিকতা লুকিয়ে থাকে

Read More »
Scroll to Top