কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এক সহিংস ঘটনায় পীর শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নিহত হয়েছেন। ঘটনাটি শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর গ্রামে ঘটে, যেখানে শতাধিক মানুষের একটি মিছিল তাঁর প্রতিষ্ঠিত আস্তানায় হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলার সময় তাঁকে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়; পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রায় ১৮ মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গ্রামীণ পাকা সড়ক দিয়ে স্লোগান দিতে দিতে শতাধিক মানুষ আস্তানার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে তারা সেখানে পৌঁছে একতলা পাকা ভবন ও একটি টিনশেড ঘরে প্রবেশ করে ভাঙচুর শুরু করে। ভবনের ছাদসহ বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত করা হয় এবং পরবর্তীতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় আস্তানার ভেতরে থাকা কয়েকজন আহত হন এবং অনেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে যান। পরে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
পুলিশ, প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগের একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও—যেখানে শামীম রেজাকে পবিত্র কোরআন সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ—শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুনরায় ছড়িয়ে পড়ে। এই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি জানান, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ক্ষোভ জমতে থাকে এবং শনিবার সকালে আস্তানা থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হন। সেখানে বৈঠক করে দুপুরের পর হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, খবরটি সকালেই প্রশাসন ও পুলিশের কাছে পৌঁছে যায় এবং এলাকায় পুলিশ উপস্থিত ছিল। তবে জোহরের নামাজের পর বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন বয়সী লোকজন লাঠিসোঁটা, রড ও হাঁসুয়া নিয়ে আস্তানার দিকে অগ্রসর হয়। হামলা প্রায় আধা ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান জানান, আহত অবস্থায় তিনজনকে হাসপাতালে আনা হলে শামীম রেজার অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক। শামীম রেজাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়েছিল এবং চিকিৎসা শুরু করার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়। অন্য আহতদের মধ্যে একজন নারী ও একজন পুরুষ রয়েছেন, তাঁরা বর্তমানে শঙ্কামুক্ত।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি পুরোনো হলেও সেটি নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার পর জনতার মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তিনি জানান, ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও বিক্ষুব্ধ জনতার তুলনায় তাদের সংখ্যা কম ছিল, ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর ভাষায়, “শামীম রেজাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।”
নিহত শামীম রেজার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জানা যায়, তিনি ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে ফিলিপনগর উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি, কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বিকম সম্পন্ন করেন। এরপর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এমকম ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কেরানীগঞ্জে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে এক পীরের অনুসারী হয়ে খাদেম হিসেবে জীবনযাপন শুরু করেন এবং পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ২০০৭ সালে বিয়ে করলেও সেই সংসার স্থায়ী হয়নি।
২০১৮ সালের দিকে শামীম রেজা নিজ গ্রামে ফিরে এসে পৈতৃক জমিতে একটি দরবার প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয়দের মতে, তাঁর দরবারে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে গানবাজনার আয়োজন হতো। ২০২১ সালের মার্চ মাসে এক অনুসারীর শিশুপুত্রের দাফনে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তিনি আলোচনায় আসেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শামীম রেজাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিন মাস কারাভোগের পর তিনি মুক্তি পান।
এছাড়া স্থানীয়দের একটি অংশ অভিযোগ করেন, তিনি ইসলামের কিছু মৌলিক ইবাদত সম্পর্কে ভিন্নধর্মী মত প্রচার করতেন এবং অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত ধর্মীয় আচারের বাইরে কিছু প্রথা চালু করেছিলেন।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে এবং তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে একটি হত্যা মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে দেশের সাম্প্রতিক ‘মব সহিংসতা’ পরিস্থিতিও আবার সামনে এসেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওই বছরে গণপিটুনি বা মব সহিংসতায় অন্তত ১৯৭ জন নিহত হন, যা আগের বছরের ১২৮ জনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
এ বিষয়ে পূর্বে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল মন্তব্য করেছিলেন যে, মব সহিংসতা একটি “দুর্ভাগ্যজনক প্রবণতা”। একইভাবে বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব গ্রহণের পর মব কালচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান এবং এ ধরনের সহিংসতা বন্ধের ওপর জোর দেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে।
তারিখ: ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
এ বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন: prothomalo, prothomalo, dhakatribune, kalerkantho, banglatribune, prothomalo, bbc
Click here to read this article in English





