ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় একটি পোশাক কারখানার ভেতর থেকে দীপু চন্দ্র দাস নামের একজন শ্রমিককে ধরে নিয়ে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা এবং পরে মরদেহে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নিহত দীপু চন্দ্র দাস (২৭–২৮) একজন গার্মেন্টস শ্রমিক, যিনি পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানায় কর্মরত ছিলেন। ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে ঘটনার সূত্রপাত, কারখানা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিক্রিয়া এবং অভিযোগের সত্যতা—সবকিছুই এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে।
ঘটনার পটভূমি
গত বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা থেকে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় অবস্থিত পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানার ভেতরে উত্তেজনা শুরু হয়। শ্রমিকদের একটি অংশের দাবি, কাজের সময় কথোপকথনের মধ্যে দীপু চন্দ্র দাস নবী মুহাম্মদ সম্পর্কে কটূক্তি করেন। তবে এই অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভাষ্য বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ কেউ উপস্থাপন করতে পারেনি।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) পরবর্তীতে জানায়, ধর্ম অবমাননার অভিযোগটি “খুবই অস্পষ্ট” এবং দীপু কী বলেছেন—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কারখানার ভেতরে শুরু হওয়া বাগ্বিতণ্ডা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে বিষয়টি কারখানার বাইরের লোকজনের কাছেও পৌঁছে যায়।
কারখানা থেকে জনতার হাতে তুলে দেওয়া
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত সাড়ে আটটার দিকে কারখানার বাইরে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়ে গেট ভাঙার চেষ্টা করে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় লোকজন বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে; এর মধ্যে ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর’ ধ্বনিও শোনা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
একপর্যায়ে পকেট গেট ভেঙে দীপু চন্দ্র দাসকে কারখানার ভেতর থেকে টেনে বের করে নেওয়া হয়। কারখানার জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) উদয় হোসেন বলেন, পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং শিল্প পুলিশ ও থানা-পুলিশকে জানানো হয়। তাঁর দাবি, দীপুকে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং তাঁকে নিরাপদে বের করে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা ছিল। তবে পুলিশ ও র্যাবের বক্তব্যে বলা হয়েছে, দীপুকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর না করে উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়।
নির্মম হত্যাকাণ্ড
কারখানা থেকে বের করে নেওয়ার পর দীপু চন্দ্র দাসকে প্রথমে মারধর করা হয়। এরপর তাঁকে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের স্কয়ার মাস্টারবাড়ী বাসস্ট্যান্ড এলাকার বিভাজকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি গাছের সঙ্গে বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে পিটিয়ে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। পরে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার সময়ও ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর’ স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। হত্যার পর প্রায় দুই ঘণ্টা ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে বিক্ষুব্ধ জনতা। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অর্ধদগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
নিহতের পরিচয় ও পারিবারিক বক্তব্য
নিহত দীপু চন্দ্র দাস ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বানিহালা ইউনিয়নের মোকামিয়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা রবি চন্দ্র দাসের ছেলে। পরিবার জানায়, তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
দীপুর বোন চম্পা দাস ও স্ত্রী মেঘনা রানী দাবি করেন, দীপু ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার মতো মানুষ ছিলেন না। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি শিক্ষিত, শান্ত স্বভাবের এবং সাধারণ বাটন মোবাইল ব্যবহার করতেন। তাদের অভিযোগ, কারখানার অভ্যন্তরীণ বিরোধ, উৎপাদন বাড়ানো নিয়ে মতবিরোধ এবং পদোন্নতি–সংক্রান্ত ঈর্ষা থেকে একটি চক্র তাঁকে ফাঁসাতে পারে। এর আগেও তাঁর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ ওঠে, যা তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল বলে পরিবারের দাবি।
মামলা, গ্রেপ্তার ও তদন্ত
ঘটনার পর নিহতের ছোট ভাই অপু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে ভালুকা মডেল থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ১৪০–১৫০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
র্যাব ও পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন কারখানার ফ্লোর ইনচার্জ, কোয়ালিটি ইনচার্জ এবং কয়েকজন শ্রমিক। র্যাব জানায়, দীপুকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করা এবং পুলিশের কাছে হস্তান্তর না করার অভিযোগে কারখানার সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে ঘটনার পেছনের কারণ ও জড়িতদের ভূমিকা নির্ধারণের চেষ্টা করছেন।
দেশ–বিদেশে প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া
এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশেও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব কর্মসূচিতে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা এবং সংখ্যালঘু ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনা ঘিরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেক নেটিজেন প্রশ্ন তুলছেন—এই হত্যাকাণ্ডের বিচার আদৌ হবে কি না, নাকি এটি অতীতের বহু সংখ্যালঘু সহিংসতার মতোই বিচারহীন থেকে যাবে।
তারিখ: ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫
এ বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন: banglatribune, somoynews, samakal, ajkerpatrika, bdnews24, dhakapost, prothomalo, thedailystar, bbc, prothomalo
Click here to read this article in English




