নরসিংদীর একটি গ্যারেজে গভীর রাতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে এক তরুণ শ্রমিকের মৃত্যু। নিহত চঞ্চল ভৌমিকের মৃত্যু দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—এ প্রশ্নের কোনো নিশ্চিত উত্তর এখনো দিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
চঞ্চল ভৌমিক (২৫) কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা খোকন ভৌমিক ছয় মাস আগে মারা যান। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন চঞ্চল। গ্রামে তাঁর মা ববিতা ভৌমিক ও বড় ভাই উজ্জ্বল ভৌমিক বসবাস করেন। উজ্জ্বল ভৌমিক শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী এবং কোনো পেশায় যুক্ত নন। সাত বছর ধরে চঞ্চল নরসিংদী সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের দগরিয়া এলাকায় একটি গ্যারেজে ইঞ্জিন মেকানিক হিসেবে কাজ করতেন এবং কাজের সুবিধার জন্য প্রায় প্রতিদিনই গ্যারেজের ভেতর ঘুমাতেন।
ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার দিবাগত রাতে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, ওই রাতে চঞ্চল গ্যারেজের ভেতর ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে সেখানে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। আগুন নেভানোর পর গ্যারেজের ভেতরেই চঞ্চলের অগ্নিদগ্ধ নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরদিন শনিবার ভোরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শনিবার সন্ধ্যায় মরদেহ কুমিল্লায় নেওয়া হয় এবং রোববার দুপুরে নিজ গ্রামের শ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে দেখা যায়, ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের পাশে দগরিয়া এলাকায় পাশাপাশি তিনটি টিনশেড দোকান রয়েছে। মাঝের দোকানটি গ্যারেজ, যার দুই পাশে একটি গাড়ি রং করার দোকান এবং অন্যটি গাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রির দোকান।
চঞ্চলের সহকর্মী শান্ত দেবনাথ (২২), যিনি তিন বছর ধরে ওই গ্যারেজে কাজ করছেন, বলেন—চঞ্চল নিয়মিত রাতগুলো গ্যারেজেই কাটাতেন। আগুন লাগার খবর পেয়ে সকালে এসে তিনি সহকর্মীর পোড়া মরদেহ দেখতে পান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চঞ্চলের সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল—এমন কথা তিনি কখনো শোনেননি বা দেখেননি। কাজ ছাড়া চঞ্চল খুব বেশি বাইরে যেতেন না।
শান্ত দেবনাথ আরও জানান, সিসিটিভি ফুটেজে যাকে দেখা গেছে, তাকে আগে কখনো ওই এলাকায় দেখা যায়নি। ফুটেজে দেখা যায়, ওই ব্যক্তি আশপাশ থেকে মবিলমাখা কাগজ ও কাপড় কুড়িয়ে এনে গ্যারেজের শাটারের সামনে আগুন ধরান। ফুটেজ অনুযায়ী, আগুন ধরানোর পর ওই ব্যক্তি ঘটনাস্থলে প্রায় এক থেকে দুই ঘণ্টা অবস্থান করেন। গ্যারেজের ভেতরও মবিল ছড়িয়ে ছিল, ফলে আগুন দ্রুত ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘুমন্ত চঞ্চলের শরীরে আগুন লাগে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গ্যারেজের মালিক রুবেল মিয়া এই ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, চঞ্চলের মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে এবং তিনি এটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবেই সন্দেহ করছেন। তিনি বলেন, চঞ্চল যে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন, তার মৃত্যুতে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ঘটনার পরদিন রুবেল মিয়া বাদী হয়ে নরসিংদী মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
নিহতের পরিবারও এই মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে মনে করছে। চঞ্চলের মা ববিতা ভৌমিক মুঠোফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁর ছেলেকে কেউ আগুন দিয়ে হত্যা করেছে। তাঁর ভাষায়, সংসার চালানোর মতো আর কেউ অবশিষ্ট নেই। একই দাবি করেছেন চঞ্চলের কাকা দূর্যোধন ভৌমিক। তিনি জানান, নরসিংদীতে চঞ্চলের কোনো বিরোধ বা সমস্যার কথা তারা কখনো শোনেননি। আগুন লাগার খবর পেয়ে তাঁরা রাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং আগুন নেভার পর চঞ্চলের মরদেহ দেখতে পান। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে শুরুতে শর্টসার্কিটের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও পরে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় ভিন্ন চিত্র সামনে আসে। নরসিংদী মডেল থানার এক উপপরিদর্শক জানান, ফুটেজে এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে গ্যারেজের সামনে আগুন ধরাতে দেখা গেছে। তবে ওই ব্যক্তির দেওয়া আগুন থেকেই গ্যারেজের ভেতরের মূল অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশের দাবী, ফুটেজে ওই ব্যক্তির আচরণ দেখে তাকে মানসিকভাবে অসুস্থও মনে হতে পারে—এই বিষয়টিও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ আর আল মামুন এবং তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিসিটিভিতে দেখা ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এই ঘটনায় থানা-পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও গোয়েন্দা বিভাগ কাজ করছে। ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় পার হলেও এখনো কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যা মামলা হিসেবে বিষয়টি নথিভুক্ত করা হলেও এটি নিশ্চিতভাবে হত্যাকাণ্ড নাকি দুর্ঘটনা—সে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
তারিখ: ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬
এ বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন: prothomalo, dw, banglatribune, somoynews, samakal, thedailystar, ajkerpatrika, manobkantha
Click here to read this article in English





