জনপ্রিয় প্রাক্তন মুসলিম অ্যাক্টিভিস্ট, ইউটিউবার ও মানবাধিকার কর্মী সেলিম ওয়াস্তিক বর্তমানে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর ওপর চালানো এই হামলার পেছনে কী কারণ, কারা জড়িত এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া কতটা আইনসম্মত—এই সব প্রশ্ন ঘিরে তদন্ত এখনো চলমান।
ঘটনার সূত্রপাত উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদ জেলার লোনি এলাকার আশোক বিহার কলোনিতে। গত শুক্রবার সকালে সেলিম ওয়াস্তিকের বাড়ির সঙ্গে সংযুক্ত অফিসে হঠাৎ করেই বাইকে চড়ে আসা দুই যুবক প্রবেশ করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, হামলাকারীরা হেলমেট পরিহিত অবস্থায় ছিল এবং কোনো কথাবার্তা না বলেই ঘরের ভেতরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে সেলিমের গলা ও পেটে একাধিকবার আঘাত করে। গুরুতর রক্তক্ষরণে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। প্রতিবেশীরা দ্রুত পুলিশে খবর দিলে তাঁকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়, পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য দিল্লির গুরু তেগ বাহাদুর হাসপাতাল (জিটিবি হাসপাতাল)-এ স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, তাঁর শারীরিক অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক এবং তিনি জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন।
সেলিম ওয়াস্তিক একজন পরিচিত প্রাক্তন মুসলিম (এক্স-মুসলিম) অ্যাক্টিভিস্ট ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর। ইউটিউব, পডকাস্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইসলামের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশীলন নিয়ে সমালোচনামূলক আলোচনা করে আসছেন। তাঁর বক্তব্যে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা, নারীর অধিকার, তিন তালাক, হালাল প্রথা এবং ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের মতো বিষয় উঠে এসেছে। তাঁর দুটি ইউটিউব চ্যানেলে মোট প্রায় ১৭৯টি ভিডিও রয়েছে এবং সম্মিলিতভাবে সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা প্রায় ২৮ থেকে ৩০ হাজারের মধ্যে। ইসলাম ত্যাগ করার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও তার পেছনের কারণও তিনি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছিলেন। এই কর্মকাণ্ডের কারণেই তিনি সমর্থন ও সমালোচনা—দুয়েরই মুখোমুখি হন।
হামলার পর সেলিম ওয়াস্তিকের পরিবার এটিকে পরিকল্পিত হত্যাচেষ্টা বলে অভিযোগ করেছে। তাঁর ছেলে উসমান গণমাধ্যমকে জানান, এই আক্রমণ হঠাৎ বা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। পরিবারের ঘনিষ্ঠ মহল এবং তাঁর সমর্থকদের একাংশের ধারণা, ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর বিরাগভাজন হওয়ার কারণেই এই হামলা ঘটে থাকতে পারে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো উদ্দেশ্য বা মোটিভ নিশ্চিত করেনি।
ঘটনার তদন্তে স্থানীয় লোনি পুলিশ স্টেশন সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ শুরু করে। তদন্তে পাঁচ থেকে ছয়জনের নাম উঠে আসে বলে পুলিশ সূত্রে জানা যায়। তাদের মধ্যে জিশান নামের এক যুবককে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পুলিশ জানায়, অভিযুক্তকে ধরতে রবিবার সকালে অভিযান চালানো হলে নিথোরা আন্ডারপাসের কাছে সে পালানোর চেষ্টা করে এবং পুলিশের দিকে গুলি চালায়। পুলিশের পাল্টা গুলিতে জিশান ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। এই ঘটনায় পুলিশ একটি মোটরবাইক, একটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং কার্তুজ উদ্ধার করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এনকাউন্টারে তাদের কোনো সদস্য আহত হয়নি।
বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে যখন জানা যায়, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ঘটনার পরপরই পরিস্থিতির খোঁজ নেন এবং দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির নির্দেশ দেন।
বর্তমানে সেলিম ওয়াস্তিক দিল্লির জিটিবি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তদন্তের অনেক দিকই অনিশ্চিত রয়ে গেছে। হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য পেছনের নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে এই ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
তারিখ: ০৭ মার্চ, ২০২৬
এ বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন: eisamay, ndtv, timesofindia, indianexpress, indiatoday, hindustantimes, news18, abplive, kolkata24x7
Click here to read this article in English





